চিয়ংগায়্চেয়নের পরের পর্ব লেখার কথা ছিল। কিন্তু জানেনই তো কেউ কথা রাখেনি। আমিই বা রাখব কেন? ইচ্ছা হলে লিখবখন। আপাতত কোরিয়ার খাবার-দাবার নিয়ে একটু লিখি। অনেকের অনেক অভিজ্ঞতা আছে। আমাদের খুব একটা নেই। তবু যেটুকু জানি লিখি। আমি লেখাটাকে মোটামুটি ৩ ভাবে ভাগ করেছি। প্রথমভাগে আছে স্ট্রীট-ফুড, পরেরভাগে লাঞ্চ-ডীনার টাইপ, তাপ্পর ঘরোয়া কোরিয়ান খাবার। তারপর কিছু বেঁচে থাকল মনে হলে ঢুকিয়ে দেব কোনো এক দলে। প্রথমে স্ট্রীট-ফুড দিয়েই শুরু করি। আগেরদিনই লিখেছি যে কোরিয়ান স্ট্রীটফুড গুছিয়ে ভালো খেতে। আমরা থাকি ইঞ্চিয়নে, ইউনিভার্সিটি লাগোয়া অঞ্চলে। এইসব জায়গা সবসময়ই ফাস্ট-ফুডের জন্য ভালো হবেই। প্রসঙ্গে বলে রাখি, স্ট্রীটফুডের জন্য কিছু স্পেসিফিক জায়গা আছে। আমরা ইঞ্চিয়ন বাস স্ট্যান্ড, ইনহাদে, সিওলের হংদে, ইনসাদং, সিটি হল এসব জায়গায় খেয়েছি। হংদে আর ইনসাদং হাল স্ট্রীটফুডের স্বর্গ।
গেরংপ্যং - আসার দু-একদিন পর প্রথম বিকেলে যে জিনিসটা
খেয়েছিলাম তাকে বলে গেরংপ্যং। একটা দোকানের সামনে অনেক ছেলে-মেয়ে খাচ্ছে দেখে আমরাও গেলাম। মাত্র ৬০০ইয়ন দামের
একটা প্যানকেক টাইপ বস্তু। ভিতোরে একটা হাল্ফ সেদ্ধ (ঠিক হাফও নয়, ঐ হাফ বয়েল আর ফুল সেদ্ধর মাঝামাঝি একটা ব্যপার)
ডিম। খেতে বেশ ভালই, কিন্তু খুব ভালও না।
ভবিষ্যতে আর খাইনি। ছবি পাচ্ছিনা খুঁজে, পেলে লাগিয়ে দেব।
![]() |
| গেরংপ্যং |
![]() |
| তিওকবক্কি (নেট থেকে ছবি) |
ওদেং - এটা একটা ফিশকেকের প্রিপারেশন। ঐ তিওকবক্কির
স্টলেই ওর পাশেই থাকে। একটা লম্বা কাঠিতে একটা ফিশকেককে জিগজ্যাগভাবে ঘেঁথে দেয়। পাতলা
করে কাটা কোনো সামুদ্রিক মাছের ফিলে, তারউপরে একটা পাতলা কেকের কোটিং। সাথে আপনি স্যুপ নিতে পারেন। তথাকথিত বাঙালী রেস্টুরেন্টের
মত স্যুপ নয়। একটা ওপেন কড়াইতে সুয়্প সারাদিন
ফুটছে। আপনার ওদেং-ও ওতেই ডোবানো ছিল। পাশে কাগজের কাপ আছে (আমাদের চায়ের কাপের মত),
ওটায় যত ইচ্ছা নিন,
খান। আপনি যদি আমার মত খাঁটি
ঘটিমনোভাবাপন্ন হন, প্রথমপ্রথম খেতে চাইবেননা।
কারণ শুঁটকি মাছের মত একটা গন্ধ। দেবপ্রিয়া,
আমার স্ত্রী, যখন প্রথম দিন থেকেই সেটা হাপুস-হুপুশ করে খেত,
আমি ভাবতাম খাচ্ছে কি'করে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, শীত একটু পড়ার পর, একদিন অল্প খেয়ে দেখলাম, এখন আমি ওর থেকে বেশি স্যুপ খাই। দাম অ্যারাউন্ড ১০০০ ইয়ন।
![]() |
| ওদেং(নেট থেকে ছবি) |
তুইঙ্গিম - নামটা একটু অন্যরকমও হতে পারে,
কিন্তু আমি এটাই বুঝেছি। এটা
একটা ফ্রায়েড স্ন্যাকস টাইপ, অনেকটা চপ-টাইপ। তিওকবক্কি
বা ওদেঁ-এর স্টলে পাওয়া যায় অনেকসময়। আবার শুধু আলাদা এর স্টলও আছে অনেক। অনেকরকম ভাজা
আইটেম থাকে, ছবি দেখলেই বুঝবেন। কোনোটা আলুর, কোনোটা চিকেন, রাঙা-আলুর, চিংড়ির বা কোনো সামুদ্রিক মাছের। উপরে একটা কোটিং
(অনেকটা আমাদের বেনফিশের বাটারফ্রাই-এর মত) । কিন্তু আসল পার্থক্য প্লেটে।
জায়গা বিশেষে একএকরকম দাম। দাম ৩০০০ থেকে ৫০০০ ইয়নের মধ্যে (১১০০ ইয়ন= ১ডলার ধরে নেবেন)। আপনি নিজে কোনো ৫বা৬টা আইটেল
পছন্দ করে দিলেন, দোকানী এবার সেগুলোকে
কাঁচি দিয়ে কেটে প্লেটে সাজিয়ে উপরে অগে বলা লাল-সস ( কোথাও কোথাও তিওকবক্কিও) ঢেলে
দেবে। পাশে আগে বলা স্যুপও থাকবে। যত ইচ্ছা স্যুপ খান। একটা ছোট্ট বো'লে একটা লংকার সস রাখান থাকবে, তাতে একটা মোটা মাথার পেইন্ট ব্রাশ। ঐ ব্রাশে করে
যত ইচ্ছে সস নিয়ে (অল্প নিলেই আপনি শেষ যদিও) আপনার চপে মাখিয়ে নিন। এবার খেয়ে ফেলুন।
(ক্ষিদে পেয়ে গেল, লিখতে লিখতে)
![]() |
| তুইঙ্গিম |
বুঙ্গিওপ্পম - এটা আমার জন্য অসম্ভব বাজে খাবার।
কিন্তু অনেকেই বেশ খায়। একটু শীত পড়লে স্টলে
স্টলে একে দেখা যায়। শেপ মাছের মত। একদম চারাপোনার শেপে বানায়। উপরের কোটিং
থাকে প্যানকেকের মত, ভিতেরে একটু মাছ আর
বাকিটা রেডবীন পেস্ট দিয়ে স্টাফড। ২০০০ডলারে ৪-৫ পিস হয় মোটামুটি। আমার সাজেশন খাবেননা।
![]() |
| বুঙ্গিওপ্পম(নেট থেকে ছবি) |
মান্ডূ/ডাম্প্লিং- আমাদের মোমোর বড়দা। দাম আয়তন
ও ভিতরের বস্তুর উপর ভিত্তি করে পাল্টায়। স্টলগুলোতে সারাক্ষণ ভাজে, ফলে গরম-গরম খেতে অসাধারণ ভালো। ভিতরের পুর কিমচি
থেকে শুরু করে চিকেন, পর্ক, আলু যা খুশী হতে পারে। মার্কেটগুলোতে ফ্রোজেন মান্ডুও
পাওয়া যায়, বাড়ি গিয়ে ভেজে খান,
দারুণ।
![]() |
| মান্ডূ/ডাম্প্লিং(নেট থেকে ছবি) |
হোত্তেওক - এটাকে আমরা প্যানকেক বলি অনেকসময়। কিন্তু
এর সাথে প্যানকেকের ডিফারেন্স আছে। এর ভিতরে পুর থাকে ( পুরটা খেতে অনেকটা পাটিসাপ্টার
পুরের মত)। সারক্ষণ গরম প্যানে পরে থাকে, কেউ চাইলে তেন ঝেড়ে দেয়। দাম ২০০০ এর মধ্যেই হয়।
![]() |
| হোত্তেওক |
দাক্কোচি - এটা আমার স্ট্রীটফুডের লিস্টের সেরা
খাবার। এটা প্রথম খেয়েছিলাম চিয়ংগাইচিয়নে। ঐ লেখা থেকেই
কপি করে দিই।
" প্রায় দেড় ফুট লম্বা
টুথপিকের মত বাঁশের কাঠি ( কি বলে জানিনা) তাতে মাংস-সেলেরি এসব ভাজা গাঁথা আর পুড়িয়ে
পুড়িয়ে রাখছে সশ মাখিয়ে। দেখে বেশ লাগল, জিভে জল-টল এসে একটা কিনে ফেললাম। অসাধারণ খেতে, সেটা উনার ছবি একটা লাগাছি, মুখ দেখেই বুঝে যাবেন। সাথে কাগজের কাপে একটা ঝোল
মত। এটা ফ্রি। কোরিয়ানগুলো দেখছি ২-৩ কাপ করে সেই স্যুপ বা জল যাই বলুন খেয়ে যাচ্ছে। আমরা টেস্ট করব বলে একটা
কাপ নিলুম। চুমুক দিয়েই শুঁটকির স্যুপ! আমার
ঘটি সত্তা জেগে উঠল, খাবই না। তো সেই স্যুপ
আমার বাঙাল বৌ হাপুস-হুপুস করে খেল। একটা কাঠি দুজনে মিলে খাওয়ার পর তেনার ইচ্ছা আরো
খাবো একই জিনিস। এবার আমি বোঝালাম, "দ্যাখ, সামনে কত দোকান,
এক জিনিস খেয়ে পেট ভরালে হবে?"
তিনি বুঝলেন। যেটুকু কোরিয়ান
জানি তাতে দাম জিজ্ঞাসা করলাম, "ওলমাএয়ো?" বলে কিনা দেড়-হাজার
ইয়ন। বেশ সস্তা, এক হাজার ইয়ন মানে
এক ডলারের কিছু কম। এখানে এক ডলারের কম কিছু পাওয়াই যায়না। সেখানে এটা বেশ সস্তা।"
![]() |
| দাক্কোচি |
![]() |
| দাক্কোচি |
তাকোয়াকি - চীস বল উইথ শ্রিম্প? বলা যেতে পারে এরকম। বানানোর প্রেসেসটা বেশ ভালো। কয়েকটা ছবি লাগাচ্ছি, দেখে বুঝবেন। চীস বলের মতই খেতে, কিন্তু ভিতরে চিংড়ি
বা স্কুইড থাকে। আর কয়েকটা বলের উপরে তেরিয়াকি সস আর রেড সস মিশিয়ে ঢেলে দেয়। দাম ঐ
৩০০০ এর আসেপাশে। আচ্ছা, এই ফাঁকে রেড সসটা বলে নিই। আমি যতটা বুঝেছি তাতে
সয়াসসের সাথে রেড পেপার পেস্ট (এখানকার ভাষায় "ঘোচুজাং") আর রাইস সিরাপ মিশিয়ে
বানায়
![]() |
| তাকোয়াকি (বানানো শুরু) |
![]() |
| তাকোয়াকি (মাঝের স্টেজ) |
![]() |
| তাকোয়াকি (ফাইনাল প্রোডাক্ট) |
বেয়নদেগি - এটা সাহস করে খেতে পারিনি। পারব বলেও
মনে হয়না। স্টীমড সিল্কওর্ম। আর কিইবা বলি। এর থেকে বেশি জানিনা। ছবি লাগাচ্ছি একটা
নেট থেকে নামিয়ে, দেখে বুঝে নিন।
![]() |
| বেয়নদেগি (নেট থেকে ছবি) |
সান্দে - ভাববেন না যে এটা কোনো আইসক্রীম। এটা পর্কের
ব্লাড-সসেজ। দেখতে কেমন একটা বলে এখনো সাহস করে খেতে পারিনি। নেটের থেকে পাওয়া ছবিই
দিলাম।
![]() |
| সান্দে (নেট থেকে ছবি) |
স্মোকড শুঁটকি ?? - এটাকে কি বলব? জানিনা। শুঁটকি তো
অবশ্যই। কিন্তু কিসের? কোন মাছ জানিনা। কোরিয়ার প্রিয় স্ন্যাক্স। সবজায়গায়
পাবেন। যেখানে সেখানে সবাই বিস্কুটের মত খায় (এমনকি আমাদের ল্যাবে লোকজন খেতে খেতে
রিসার্চও করে)। খেয়ে দেখেছি, একেবারে খারাপও নয়
![]() |
| স্মোকড শুঁটকি(নেট থেকে ছবি) |
গিম-বাপ - বাপ মানে ভাত। গিম-বাপ খেতে বেশ ভালো।
এটা অনেক ভ্যারিয়েশনে পাওয়া যায়। ভাতটা ফ্রায়েড থাকে। কোরিয়ান রাইস স্টিকি। ফলে যেকোনো
শেপ করা সহজ। কখোনো গোল, কখোনো ত্রিকোণ আকারে থাকে। আর পুরোটা থাকে সী-উইড
-এর কভারে। seaweed একটা সামুদ্রিক পাতার মত ব্যাপার ( এর বেশি জানিনা, বায়োলজিতে কাঁচা) খেতে বেশ ভালো। অনেকসময়ই দুপুরের লাঞ্চও অনেকে ২-৩ টে গিম-বাপ
দিয়েই সেরে নেয়। দাম সাইজের উপর নির্ভর করে ৭০০ থেকে ২০০০ অব্দি হয়।
| গিম-বাপ(নেট থেকে ছবি) |
টর্নাডো পটাটো - এর কোরিয়ান নাম জানিনা। একটা গোটা
আলুকে অদ্ভুতভাবে কেটে লম্বা কাঠিতে গুঁজে ফ্রাই করে দেয়। খেতে চিপসের মত। কিন্তু মিস্টি
মিস্টি। কিছু একটা সস মেশায়। দাম ২০০০ মতন।
![]() |
| টর্নাডো পটাটো(নেট থেকে ছবি) |
এছাড়াও প্রচুর রকমের ওয়াফেল, প্যানকেক, হটডগ বা আরো কিছু পাওয়া যায়, এখনো পুরো দেখে উঠতে পারিনি। চেষ্টা চালাচ্ছি।
হাত ব্যাথা
করছে। পরের এপিসোড আসবে খুউব শ্রীঘ্রই।


























